মুহাম্মদ শেফা উদ্দিন:
প্রস্তাবিত কক্সবাজার সিটি করপোরেশনকে শীঘ্রই সরকার বাংলাদেশে ১৪তম সিটি করপোরেশন ঘোষণা করতে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রাথমিক সীমানা নির্ধারণ ও জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে গণশুনানি ও তথ্য যাচাই -বাছাই সম্পন্ন হয়েছে। হয়তো মাসদেড়েকের মধ্যে কক্সবাজার সিটি করপোরেশন চূড়ান্ত রূপ নেবে। এ ঘোষণার মধ্যে দিয়ে কারো খুশির কারণ হতে পারে, আবার কারো হতে পারে কান্না! প্রাথমিক তালিকায় কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয় হতে ২০ কিলোমিটার দুরত্বের রামু উপজেলার খুনিয়া পালং, ১৫ কিলোমিটার দুরত্বের মিটাছড়ি ইউনিয়ন স্থান পেয়েছে! এছাড়া সদর উপজেলার পিএমখালী ইউনিয়নের দুরত্ব ১০ কিলোমিটার, ঝিলংঝা ইউনিয়নের খুরুলিয়ার দুরত্ব ১২ কিলোমিটার, কক্সবাজার পৌরসভার সাথে কক্সবাজার শহরের সাথে লাগোয়া খুরুশকুল ইউনিয়ন ও ঝিলংঝা ইউনিয়ন প্রাথমিক তালিকায় স্থান পেয়েছে। খুরুশকুলের উপর দিয়ে ভারুয়াখালী ও চৌফলদন্ডী ইউনিয়নের দূরত্ব যথাক্রমে মাত্র ৮ কিলোমিটার ও ৯ কিলোমিটার অথচ এ দুইটি ইউনিয়ন প্রস্তাবিত কক্সবাজার সিটি কর্পোরেশনের প্রাথমিক তালিকায় স্থান পায়নি! প্রাথমিক তালিকায় বাদ যাওয়ার পর থেকে ভারুয়াখালী ও চৌফলদন্ডী ইউনিয়ন প্রস্তাবিত কক্সবাজার সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভূক্তির দাবীতে দুই মাস ধরে আন্দোলন করে আসছে। তারা নাগরিক ফোরাম ও নাগরিক পরিষদ গঠন করে স্থানীয়ভাবে মানববন্ধন, মিছিল, মিটিং করে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করে আসছেন । ভারুয়াখালী ও চৌফলদন্ডী উভয় ইউনিয়ন পৃথকভাবে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে বড় ধরনের গণ জমায়েত ও মানববন্ধন করে জেলা প্রশাসকের নজরে আনার জন্য চেষ্টা করেছেন। এছাড়া উভয় ইউনিয়ন প্রাথমিক তালিকায় বাদ যাওয়ার পরে কক্সবাজার সদর, রামুও ঈদগাঁও আসনের মাননীয় সাংসদ জনাব লুৎফর রহমান কাজল, সংরক্ষিত মহিলা সাংসদ জনাব শামীম আরা স্বপ্না ও মাননীয় জেলা প্রশাসক জনাব মো আব্দুল মান্নানকে সিটিতে অন্তর্ভূক্তির দাবীতে পৃথক আবেদন দিয়ে তারা সুপারিশ সংগ্রহ করেছে। গত ৭ অক্টোবর কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে প্রস্তাবিত কক্সবাজার সিটি করপোরেশনের সীমানা নির্ধারণের নিমিত্তে আয়োজিত গণশুনানিতে ভারুয়াখালী ও চৌফলদন্ডী ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মহল অংশগ্রহণ করেছেন। এ দুই ইউনিয়নের প্রতিনিধি যারা গুণশুনানিতে আলোচনায় অংশগ্রহণ করার সুযোগ পেয়েছেন তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ ইউনিয়নকে প্রস্তাবিত সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভূক্তির জন্য তাদের যোগ্যতা, সম্ভাবনা ও ন্যায্যতার কথা তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে রামু উপজেলার খুনিয়া ফালং ইউনিয়ন ও মিটাছড়ী ইউনিয়নের অন্তর্ভূক্তি পক্ষান্তরে সদর উপজেলার ঘরের ও জেলা শহরের নিকটবর্তী ভারুয়াখালী ও চৌফলদন্ডী ইউনিয়নকে প্রস্তাবিত কক্সবাজার সিটি করপোরেশনের প্রস্তাবেরর বাইরে রাখা তাদের বক্তব্যে বিষ্ময়কর ঠেকেছে ! নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখলেও ভারুয়াখালী ও চৌফলদন্ডী ইউনিয়নের দুরত্ব, যোগ্যতা ও সম্ভাবনা সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভূক্তির পক্ষে। এই দুই ইউনিয়ন পরস্পর পাশাপাশি হওয়ায় তাদের যোগ্যতাও প্রায় সেইম ক্যাটাগরিতে। উভয় ইউনিয়ন লবণ ও চিংড়ি শিল্পের জন্য উর্বর ভূমি। এই দুই ইউনিয়নে লবণ ইন্ডাস্ট্রি ও বিদেশে রপ্তানির যোগ্য চিংড়ি কারখানা গড়ে তুলে সিটি করপোরেশনে আয় বাড়ানোর সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে। যা সিটি করপোরেশনে প্রাথমিক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত অন্য কোনো ইউনিয়নে নেই। ভারুয়াখালী ইউনিয়নের আয়তন ১৫.৩৩ বর্গ কিলোমিটার, জনসংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার, জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২৫৪৪ জন। চৌফলদন্ডী ইউনিয়নের আয়তন ১৪.৭১ বর্গকিলোমিটার, জনসংখ্যা প্রায় ৪৫৬৪৫ জন, জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটার ৩১০২ জন। জনসংখ্যার বিবেচনায়ও এ দুই ইউনিয়ন কক্সবাজার সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভূক্তির যোগ্যতা রাখে। নৌপথ ও স্থল উভয় পথে যাতায়াতের সুযোগ রয়েছে ভারুয়াখালী ও চৌফলদন্ডী ইউনিয়নে। ভারুয়াখালীর উত্তর ও দক্ষিণ দুই প্রান্তেই নদীর উপর সেতু রয়েছে এবং নদী দুইটির গতিপথ চৌফলদন্ডীর মোহনা হয়ে মাত্র ৩০০ মিটার দূরে গিয়ে মহেশখালী চ্যানেলের সাথে মিলিত হয়েছে ফলে এ ইউনিয়ন হতে নৌপথ ও স্থল পথে সহজ যাতায়াতের জন্য চমৎকার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া কক্সবাজার শহরের নিকটবর্তী ইউনিয়ন হওয়ায় সিটি কর্পোরেশনের আবাসিক এলাকা ও নগর ভবন নির্মাণের সুযোগও রয়েছে। ভারুয়াখালী ও চৌফলদন্ডী ইউনিয়নকে শুধু মাত্র কৃষি জমি বেশি থাকার অজুহাতে সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে না বলে বিশেষ সূত্রে খবর বেরিয়েছে! সরেজমিনে যেই বিষয়টি উপলব্ধি করেছি প্রাথমিক তালিকায় স্থান পাওয়া পিএমখালী, খুরুশকুল, মিড়াছড়ি ও পালংখালী ইউনিয়নের কৃষি জমির পরিমাণ ভারুয়াখালী ও চৌফলদন্ডী ইউনিয়ন থেকে প্রায় ২-৩ গুণ করে বেশি হবে। ভারুয়াখালী ও চৌফলদন্ডী ইউনিয়নের মানুষ কৃষি জমি বেশি বিষয়টি তাদেরকে বাদ দেওয়ার কৌশল হিসেবে দেখছেন। গত কয়েকদিন আগে মুখেমুখে খবর বেরিয়েছে খুরুশকুল থেকে কক্সবাজারের লাগোয়া তিনটি ওয়ার্ড এবং পিএমখালী থেকে আংশিক এলাকা নিয়ে সিটি করপোরেশন গঠন করা হচ্ছে। ভারুয়াখালী ও চৌফলদন্ডী ইউনিয়নের বিজ্ঞ জনেরা মনে করছেন তারা সিটিতে অন্তর্ভূক্তির জন্য যে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ও তোড়জোড় শুরু করেছেন তা দমিয়ে দেওয়ার জন্য খুরুশকুল আর পিএমখালীর আংশিক অন্তর্ভূক্তির বিষয়টি কৌশল হিসেবে দেখছেন। যদি সত্যি সত্যি ভারুয়াখালী ও চৌফলদন্ডী ইউনিয়নকে প্রস্তাবিত সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্ত না করে পূর্বের প্রস্তাবকে বহাল রাখে তাহলে স্থানীয়দের ধারণাই সঠিক হবে।
কক্সবাজার সিটি কর্পোরেশনের প্রাথমিক যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে তাতে মোট আয়তন হয় ১৬৯.৬৪ বর্গ কিলোমিটার। ভারুয়াখালী ও চৌফলদন্ডী ইউনিয়নকে অন্তর্ভুক্ত করলে এর আয়তন দাঁড়াবে ১৯৯.৬৮ বর্গ কিলোমিটার। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত বিধৌত সিটি করপোরেশন আয়তন ১৯৯.৬৮ বর্গ কিলোমিটার হলে বেশি নয়। গাজিপুর সিটি কর্পোরেশনের আয়তন যদি ৩৩০ বর্গকিলোমিটার হতে পারে কক্সবাজার সিটি কর্পোরেশনের আয়তন কেন ১৯৯.৬৮ বর্গ কিলোমিটার হতে পারবে না! পর্যটন শিল্পকে যদি বিকাশ করতে চাই পরিকল্পিতভাবে নগরায়ন গড়ে তুলতে হবে। পর্যটন শিল্পের বিকাশ মানে ভবনের পর ভবন নয় নগরায়নের পর নগরায়ন নয়! কিছু পার্ক, খোলামেলা জায়গা, সবুজ- শ্যামল, আলো -বাতাস যথেষ্ট প্রয়োজন রয়েছে। একটি পরিকল্পিত পর্যটন নগর ব্যবস্থার মধ্যে আরো থাকতে পারে কৃষি, মৎস্য, লবণ, জলাধার, পরিবেশ ও আবাসিক-বাণিজ্যিক এলাকার জন্য পৃথক ও সুরক্ষিত ভূমি ব্যবহারের পরিকল্পনা করা সম্ভব। বরং পরিকল্পিত নগরায়ণ হলে অনাবাদি ও অপরিকল্পিত ভূমির সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকেও প্রস্তাবিত কক্সবাজার সিটি করপোরেশনে ভারুয়াখালী ইউনিয়ন ও চৌফলদন্ডী ইউনিয়নসহ পুরো কক্সবাজার সদর উপজেলা ও রামু উপজেলার মিটাছড়ি ও খুনিয়া পালংসহ মোট ১৯৯.৬৮ বর্গ কিলোমিটারের সিটি করপোরেশন অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত।
গণশুনানিতে জেলা প্রশাসকের বক্তব্য ও মাননীয় এমপি জনাব লুৎফর রহমান কাজলের সাম্প্রতিক সময়ে ফেইসবুক পোষ্টের দৃষ্টি ভঙ্গির আলোকে অনেক শিক্ষিত ও সচেতন মানুষ ভারুয়াখালী ও চৌফলদন্ডী ইউনিয়ন প্রস্তাবিত সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে না বলে ধরে নিচ্ছেন আবার অনেকে তাদের দীর্ঘ দুই মাসের আন্দোলন, প্রচেষ্টার সঠিক মূল্যায়ন হবে বলে মনে করছেন। ভারুয়াখালী ও চৌফলদন্ডী ইউনিয়ন সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্ত করে তাদের উন্নত নাগরিক সেবা প্রাপ্তির অধিকার বাস্তবায়ন করার জোর দাবী জানাচ্ছি।

লেখক -শিক্ষক ও সমাজকর্মী